।। মোরসালিন আহমেদ ।।
হতে পারতেন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন কিংবা সুপার গ্র্যান্ডমাস্টার। কিন্তু ক্যান্ডিডেটমাস্টারে এসেই থেমে গেলেন ডেমিস হাসাবিস। হয়তো নোবেল জয় করবেন বলেই বিধাতা তাঁকে আর দাবার জগতে এগোতে দেননি। প্রোটিনের কাঠামোর বিষয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করার একটি মডেল আবিষ্কার করায় ২০২৪ সালে যৌথভাবে তিন জন বিশ্বের সর্বোচ্চ সম্মানজনক নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। তাদেরই একজন হচ্ছেন যুক্তরাজ্যের ডেমিস হাসাবিস। যিনি দাবার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো দাবাড়ু হিসেবে এমন প্রেস্টিজিয়াস পুরস্কার পেলেন।
এর আগে ডেমিস দাবার দুনিয়ায় মাত্র ১৩ বছর বয়সে ক্যান্ডিডেটমাস্টার খেতাব লাভ করে সেসময় চৌষট্টি খোপের দাবার জমিনে দারুণ ঝড় তুলেছিলেন। শুধু তাই নয়, সেসময় অনূর্ধ্ব-১৪ বছর বয়সী দাবাড়ৃদের মধ্যে তিনি বিশ্বেরর দ্বিতীয় শীর্ষবাছাই খেলোয়াড়ও ছিলেন। তাঁর সঙ্গে অপর দুইজন নোবেলজয়ী হলেন যুক্তরাষ্ট্রের ডেভিড বেকার ও স্বদেশী জন জাম্পার। ডেমিসের এমন অর্জন বিশ্বদাবায় আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এমন কি, দাবা বোর্ড থেকে নোবেল পুরস্কার অনেকের জন্য অনুপ্রেরণাও হতে পারে। নোবেল জয়ের আগে তিনি এ বছরের শুরুতে যুক্তরাজ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সেবার জন্য নাইট উপাধি পেয়েছিলেন।
অনন্য প্রতিভার অধিকারী ৪৯ বছর বয়সী ডেমিস ১৯৭৬ সালের ২৭ জুলাই যুক্তরাজ্যের লন্ডনে জন্ম গ্রহণ করেন। খুব ছোট্টবেলা থেকে দাবার মতো মেধা ও মননশীল খেলায় পারদর্শী হয়ে উঠতে থাকেন। বয়সকে পেছনে ফেলে তরতর করে শুরুতে নিজেকে আন্তর্জাতিক রেটেড দাবাড়ু হিসেবে মেলে ধরেন। এরপর ১৯৮৯ সালে মাত্র ১৩ বছর বয়সে ক্যান্ডিডেটমাস্টার উপাধি লাভের পাশাপাশি বিশ্বদাবার বিস্ময় বালক হয়ে আর্বিভাব হন। এমন কি, ইংল্যান্ডের জাতীয় জুনিয়র দলেরও নেতৃত্বে ছিলেন। এসময় তাঁর রেটিং ২৩০০ বেশি ছিল। ডেমিস যখন দাবা বোর্ডে যুদ্ধের দামামা বাজিয়ে এগিয়ে চলেছিলেন তখন তাঁর সামনে ছিলেন কেবল কিংবদন্তি দাবাড়ু হাঙ্গেরির জুডিথ পোলগার। যিনি ১৯৯১ সালে মাত্র ১৫ বছর বয়সে তৎকালীন সবকনিষ্ঠ গ্র্যান্ডমাস্টার হয়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিলেন। তাঁকে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ নারী দাবাড়ু হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অনেকে ভেবেছিলেন ডেমিস জুডিথের মতোই অল্প বয়সে দ্রুত সময়ে গ্র্যান্ডমাস্টার হয়ে বিশ্বদাবা শাসন করবেন। কিন্তু সে পথে না হেঁটে তিনি রীতিমতো দাবা বোর্ড ছেড়ে পড়াশোনায় মনোযোগী হয়ে পড়লেন।
বর্তমানে ডেমিস একজন স্নায়ুবিজ্ঞানী, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষক ও কম্পিউটার গেম ডিজাইনার হিসেবে ভীষণ পরিচিত মুখ। শুধু তাই নয়. ডিপমাইন্ডেরও প্রতিষ্ঠাতা তিনি। ডেমিসের আজকের এ অবস্থানে পৌঁছুতে দাবা যেমন তাঁর ক্যারিয়ার গড়তে ভূমিকা রেখেছিল, ঠিক তেমননিভাবে তিনিও তাঁর মেধা দিয়ে তাঁর কোম্পানি কম্পিউটার দাবাতে বিপ্লব ঘটিয়েছে। যা বিজ্ঞানের পাশাপাশি দাবাতেও তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। দাবায় ডিপমাইন্ডের প্রচলন ২০১৭ সাল থেকে। সেসময় একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছিল। যেখানে আলফাজিরো ও নিউরাল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে একটি রিইনফোর্সমেন্ট লার্নিং অ্যালগরিদমের মাধ্যমে শক্তিশালী দাবা সত্তা হয়ে ওঠার জন্য একটি প্রোগ্রাম তৈরি করেন। দাবা খেলোয়াড়দের এমন একটি জগতের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার চ্যালেঞ্জ ছিল। তবে বিশ্বজুড়ে অল্প সময়ের মধ্যেই তারা বোঝাপড়ার সঙ্গে বেড়ে উঠেছিল।
উল্লেখ্য ১৯০১ সাল থেকে সুইডিশ বিজ্ঞানী আলফ্রেড নোবেলের নাম অনুসারে বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ নোবেল পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে। প্রতি বছর পদার্থ, রসায়ন, চিকিৎসা, শান্তি ও সাহিত্য এ ৫টি খাতে বিশেষ অবদান রাখা ব্যক্তিদের পুরস্কার প্রদান করা হয়। তবে ১৯৬৯ সাল থেকে এই ৫ বিভাগের সঙ্গে অর্থনীতি যুক্ত হয়েছে। আলফাজিরোর স্রষ্টা ডেমিস এ বছর রসায়নে নোবেল পুরস্কার পাচ্ছেন। তিনি ‘প্রোটিন ভাঁজ ভবিষ্যদ্বাণী’ বিষয়ে কাজ করার জন্য জন হাম্পারের সঙ্গে ১১ মিলিয়ন সুইডিশ ক্রোনার পুরস্কারের অর্ধেক ভাগ বসিয়েছেন, যেখানে ডেভিড বেকার ‘কম্পিউটেশনাল প্রোটিন ডিজাইন’ এ অগ্রগতির জন্য বাকি অর্ধেক পাচ্ছেন।
