।। মোরসালিন আহমেদ ।।
ফিদে নারী বিশ্বকাপ দাবায় অসম এক যুদ্ধে নেমেছিলেন নারী আন্তর্জাতিকমাস্টার ওয়াদিফা আহমেদ। জর্জিয়ার বাতুমি শহরে ময়দানি লড়াইয়ে ফ্রান্সের আন্তর্জাতিকমাস্টার ও নারী গ্র্যান্ডমাস্টার দাওলেতি কোরনেতি দেইমেনতি সঙ্গে শেষ পর্যন্ত পেরে উঠেননি। প্রথম রাউন্ডে টানা দু’টি ম্যাচ হেরে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে পড়েন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে ওয়াদিফা যেনো বিশ্বকাপের মঞ্চে উত্তরসূরিদের দেখানো পথেই হাঁটলেন। তবুও এ বিদায় সম্মান আর গৌরবের। তাঁর প্রতিপক্ষের সঙ্গে শক্তি-সামর্থ্যের তুলনায় পার্থক্যটা ছিল আকাশ-পাতাল। কারণ ওয়াদিফা হলেন নারী বিভাগ থেকে আন্তর্জাতিকমাস্টার উপাধি পাওয়া দাবাড়ু। রেটিংও তাঁর সমৃদ্ধ নয়। মাত্র ২০২৩। সর্বোচ্চ সাফল্য বলতে এশিয়ান ৩.২ জোনের চ্যাম্পিয়ন। সার্ক দাবার রানারআপ। সেই সঙ্গে ঘরোরা দাবায় রয়েছে বেশ কিছু শিরোপা। পক্ষান্তরে দাওলেতি ওপেন বিভাগ থেকে পাওয়া আন্তর্জাতিকমাস্টার আর নারী বিভাগ থেকে উপাধি পাওয়া গ্র্যান্ডমাস্টার। তাঁর রেটিং ২৪০৩। এ মুহূর্তে তিনি বিশ্বের সেরা ৫০ জন নারী দাবাড়ুর একজন। তাঁর র্যাঙ্কিং ৩৯ ঘরে। এর আগেও বিশ্বকাপে খেলেছেন। গর্ব করার মতো তাঁর ইউরোপীয় দাবায় সাফল্য রয়েছে। খেলা বোর্ডে গড়ানোর আগে দাওলেতি-ওয়াদিফার ম্যাচ সর্ম্পকে দাবা বিশেষজ্ঞরা যে ধারণা করেছিলেন বাস্তবে তাই হয়েছে। প্রথম রাউন্ডের দু’টি ম্যাচই এক তরফা হয়েছে। তারপরও কিন্তু হতাশ না হয়ে ওয়াদিফা বুক চিতিয়ে লড়েছেন।
প্রথম রাউন্ডের প্রথম ম্যাচ বোর্ডে গড়ায় ৬ জুলাই। দাওলেতির সাদা ঘুঁটির বিপক্ষে ওয়াদিফা কালো ঘুঁটি নিয়ে সিসিলিয়ান ডিফেন্স অবলম্বন করে খেলা শুরু করেন। এক চাল দু’ চাল করে খেলা গড়িয়ে চলছিল। শুরুটা বেশ ভালোই করেছিলেন। কিন্তু এক পর্যায় দাওলেতি চাপে ফেলে দেন। সেটা সামাল দিতে পারেননি ১৭ বছরের কিশোরী ওয়াদিফা। ফলে ২৫ চালে এসে হেরে যান। ৭ জুলাই প্রথম রাউন্ডের দ্বিতীয় ম্যাচেও সুবিধা করতে পারেননি ওয়াদিফা। এ দিন তিনি সাদা ঘুঁটি নিয়ে খেলেন। পক্ষান্তরে দাওলেতি কালো ঘুঁটি নিয়ে সিসিলিয়ান ডিফেন্সে পাল্টা চাল দিচ্ছিলেন। মাঝে এক চাল ভুল করে বসলে হাতের মুঠো থেকে ম্যাচ বেরিয়ে যায় ওয়াদিফার। ফলে ৩৬ বছর বয়সী দাওলেতি ২২ চালে জয়ের নোঙরে পৌঁছে যান। ফলে প্রথম রাউন্ডে ০-২ গেমে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেন ওয়াদিফা। গত মার্চে শ্রীলঙ্কায় এশিয়ান ৩.২ জোনে চ্যাম্পিয়ন হবার সুবাদে ওয়াদিফা বিশ্বকাপে বাংলাদেশসহ ৬টি দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। শুধু তাই নয়, দেশের সবচেয়ে কম বয়সী নারী খেলোয়াড় হিসেবেও বিশ্বকাপে খেলে এলেন। এ বছর বিশ্বের বিভিন্ন জোনের চ্যাম্পিয়ন ও শীর্ষ পর্যায়ের মোট ১০৭ জন নকআউট পদ্ধতিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। যা ৬ জুলাই থেকে শুরু হয়ে ২৭ জুলাই শেষ হবে।
এর আগে বাংলাদেশ পাঁচবার নারী বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পেয়েছে। দেশের প্রথম নারী দাবাড়ু হিসেবে ২০১৫ সালে নারী আন্তর্জাতিকমাস্টার শামীমা আক্তার লিজা রাশিয়ার সোচিতে খেলতে গিয়েছিলেন। লিথুনিয়ার গ্র্যান্ডমাস্টার ভিক্টোরিজা কমলিটি এতোটাই শক্তিশালী ছিলেন যে, অসহায়ের মতো লিজা টানা দুই ম্যাচে হেরে যান। অর্থাৎ প্রথম ম্যাচ ২৭ ও দ্বিতীয় ম্যাচ ৩৮ চালের বেশি টিকতে পারেননি। কিন্তু ইরানের তেহরানে ২০১৭ সালে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ খেলতে গিয়ে লিজা চমক দেখিয়ে ছিলেন। ভারতের গ্র্যান্ডমাস্টার হারিকা দ্রোনাভালির সঙ্গে অসাধারণ ক্রীড়াশৈলী দেখিয়ে টানা দু’ ম্যাচ ৮৫ ও ৩৮ চালে ড্র করে কৃতিত্ব দেখিয়েছেন। র্যাপিডে প্লে অফ ম্যাচে প্রথমটিতে ৪৯ চালে হারলেও দ্বিতীয় ম্যাচে ভালো অবস্থান পেয়েও ৭৫ চালে ড্র করেন। এটাই ছিল নারী বিশ্বকাপে বাংলাদেশের সেরা সাফল্য।

কিন্ত নারী আন্তর্জাতিকমাস্টার রানী হামিদ ২০১৯ সালে রাশিয়ার কান্তি-মানসিস্ক শহরে প্রতিদ্বন্দ্বিতাই গড়ে তুলতে পারেননি। তিনি প্রথম রাউন্ডে ইউক্রেনের সুপার গ্র্যান্ডমাস্টার মুয়িচুক আনা’র কাছে অসহায়ের মতো টানা দুই ম্যাচ হেরে বিদায় নেন।
তবে দেশের তৃতীয় নারী দাবাড়ু হিসেবে ২০২১ সালে রাশিয়ার সোচিতে বিশ্বকাপে খেলেছেন নারী আন্তর্জাতিকমাস্টার শারমিন সুলতানা শিরিন। তাঁর প্রতিপক্ষ ছিলেন আমেরিকার আন্তর্জাতিকমাস্টার ইপ ক্যারিসা। প্রবল শক্তিধর এ দাবাড়ুর সঙ্গে শিরিন প্রথম রাউন্ডে দু’টি ম্যাচেই পরাজিত হয়েছেন।
এদিকে ২০২৩ সালে আজারবাইজানের বাকু বিশ্বকাপে এশিয়ান জোন ৩.২ এর নারী বিভাগ চ্যাম্পিয়ন হিসেবে নারী ফিদেমাস্টার জান্নাতুল ফেরদৌস এবং ২০২২ সালে দাবা অলিম্পিয়াডের ফলাফলের ভিত্তিতে নারী ফিদেমাস্টার নোশিন আঞ্জুম বাংলাদেশ দাবা ফেডারেশনের মনোনীত খেলোয়াড় হিসেবে অংশগ্রহণ করেন। প্রথম রাউন্ডের প্রথম ম্যাচে নোশিন পোল্যান্ডের গ্র্যান্ডমাস্টার সককো মনিকার কাছে ৩৭ চালে হেরে গেলেও দ্বিতীয় ম্যাচে মনিকার সঙ্গে ৪৩ চালে ড্র করে নোশিন অসাধারণ কৃতিত্ব দেখান।
কিন্তু জান্নাতুল রোমানিয়ার নারী গ্র্যান্ডমাস্টার বুলমাগো ইরিনার কাছে ২৯ ও ৩২ চালে দু’টি ম্যাচেই পরাজিত হন।
উল্লেখ্য দেশের হয়ে নারী দাবাড়ুদের মধ্যে সর্বোচ্চ দুইবার বিশ্বকাপে খেলেছেন লিজা। তবে সবাই প্রথম পর্ব উতরিয়ে দ্বিতীয় পর্বে যাবার আগেই বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেন।
একনজরে নারী বিশ্বকাপ দাবায় বাংলাদেশ
সাল উপাধি ও নাম
২০১৫ নারী আন্তর্জাতিকমাস্টার শামীমা আক্তার লিজা
২০১৭ নারী আন্তর্জাতিকমাস্টার শামীমা আক্তার লিজা
২০১৯ নারী আন্তর্জাতিকমাস্টার রানী হামিদ
২০২১ নারী আন্তর্জাতিকমাস্টার শারমিন সুলতানা শিরিন
২০২৩ নারী ফিদেমাস্টার নোশিন আঞ্জুম
২০২৩ নারী ফিদেমাস্টার জান্নাতুল ফেরদৌস
২০২৫ নারী আন্তর্জাতিকমাস্টার ওয়াদিফা আহমেদ #
সৌজন্যে: পাক্ষিক ক্রীড়াজগত, ১৬ জুলাই ২০২৫
