সর্বকনিষ্ঠ বিশ্বচ্যাম্পিয়ন গুকেশ

।। মোরসালিন আহমেদ ।।
নানারকম তর্ক-বির্তক আর ম্যাচ ফিক্সিংয়ের অভিযোগ পেছনে ফেলে বিশ্বদাবায় সর্বকনিষ্ঠ চ্যাম্পিয়ন হয়ে ইতিহাস গড়েছেন ভারতের গ্র্যান্ডমাস্টার গুকেশ ডোম্মারাজু। বিশ্বদাবার শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে ১৪ ম্যাচের সিরিজে গতবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন চীনের গ্র্যান্ডমাস্টার ডিং লিরেনকে ৭.৫-৬.৫ পয়েন্টে হারিয়ে এ কৃতিত্ব অর্জন করেন। চেন্নাইয়ের ছেলে গুকেশ মাত্র ১৮ বছর ৮ মাস ১৪ দিন বয়সে সর্বকনিষ্ঠ বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়ে নজির গড়েন। এর আগে ১৯৮৫ সালে রাশিয়ার গ্র্যান্ডমাস্টার গ্যারি কাসপারভ সর্বকনিষ্ঠ বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন ২২ বছর ৬ মাস ২৭ দিন বয়সে। সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন নরওয়ের গ্র্যান্ডমাস্টার ম্যাগনাস কার্লসন ভক্ত গুকেশ মাত্র ৭ বছর বয়সে খেলা শুরু করেন। ২০১৭ সালে আন্তর্জাতিকমাস্টার খেতাব লাভ করেন। এরপর ২০১৯ সালে ১২ বছর ৭ মাস ১৭ দিন বয়সে বিশ্বের দ্বিতীয় কনিষ্ঠ গ্র্যান্ডমাস্টার হন। বর্তমানে তিনি বিশ্বদাবার র‌্যাঙ্কিয়ে পঞ্চম স্থানে অবস্থান করছেন। এ মুহূর্তে তাঁর স্ট্যান্ডার্ড রেটিং ২৭৮৩, র‌্যাপিড রেটিং ২৬৫৪ ও ব্লিটজ রেটিং ২৬১৫। প্রতিভাবান এ দাবাড়ু বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার আগেই প্রিয় মাতৃভূমিকে গতবছর দাবা অলিম্পিয়াডে চ্যাম্পিয়ন করে অনন্য ভূমিকা রেখেছেন। তিনি নিজেও বিশ্বদাবায় অসংখ্যবার সাফল্য পেয়েছেন।

বিশ্বদাবার খেতাবী লড়াইয়ে মোট ১৪ ম্যাচের মধ্যে গুকেশ ৩টি ও লিরেন ২টি জয় পেয়েছেন। অবশিষ্ট ৯টি ম্যাচে ড্র হয়েছে। চৌষট্টি খোপের দাবার জমিনে শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই শুরু হওয়ার আগে তারুণ্যের বিবেচনায় গুকেশকে ফেবারিট ভাবা হলেও অভিজ্ঞতায় এগিয়ে ছিলেন লিরেন। এমন কি এ চাইনিজ প্রথম ম্যাচে ৪২ চালে জয় তুলে শিরোপা অক্ষুন্ন রাখার মিশন শুরু করেছিলেন। তাতে চাপের মুখে পড়ে গিয়েছিলেন গুকেশ। দ্বিতীয় ম্যাচে উভয়ে মাত্র ২৩ চালে ড্র করলেও তৃতীয় ম্যাচে গুকেশ ৩৭ চালে লিরেনকে হারিয়ে সমতায় ফেরেন। এরপর টানা সাত ম্যাচ কেউ কাউকে হারাতে পারেননি। চতুর্থ ম্যাচ ৪২ চালে, পঞ্চম ম্যাচ ৪০ চালে, ষষ্ঠ ম্যাচ ৪৬ চালে, সপ্তম ম্যাচ ৭২ চালে, অষ্টম ম্যাচ ৫১ চালে, নবম ম্যাচ ৫৪ চালে ও দশম ম্যাচ ৩৬ চালে অমিমাংসিতভাবে শেষ হয়। একাদশ ম্যাচে এসে লিরেনের ভুলের সুযোগে জয় হাতছাড়া করেননি গুকেশ। ২৯ চালে জয় তুলে নিয়ে লিড নেন ভারতীয় এ দাবাড়ু। কিন্তু সমতায় ফেরতে লিরেন মোটেও কালবিলম্ব করেননি। পরের ম্যাচেই তিনি ৩৯ চালে গুকেশকে হারিয়ে শিরোপা অক্ষুন্ন রাখার সুপ্ত বাসনা ফের জাগিয়ে তুলেন। শেষ দুই ম্যাচ নিয়েও জল্পনা কম ছিল না। এমতবস্থায় এয়োদশ ম্যাচ ৬৯ চালে ড্র হয়। ফলে চর্তুদশ তথা শেষ ম্যাচ ঘিরে সবার আগ্রহ দৃষ্টি হয়।

কাজেই চর্তুদশ ম্যাচটি ড্র হবে নাকি কেউ জয় পাবে- এ নিয়ে গোলকধাধার মধ্যে পড়ে যান সবাই। মানে লিরেন জয়ী হলে শিরোপা অক্ষুন্ন রাখবেন। অন্যদিকে গুকেশ জয়ী হলে দাবার ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ হয়ে শিরোপা জিতবেন। এ রকম নানা জল্পনার মধ্যে লিরেন-গুকেশ ম্যাচ শুরু হয়। উভয় সর্তকতার সঙ্গে ভেবে-চিন্তে এক অপরের বিপক্ষে চাল দিচ্ছিলেন। এমন কি, ম্যাচটি ক্রমশ: ড্রয়ের পথে হাঁটছিল। কিন্তু লিরেন দাবা বোর্ডে এমন এক চাল ঠেলে দিলেন যা গুকেশকে জয়ী করে তোলে। এ নিয়ে ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়, যা তাঁকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে!
কেননা আগের টানা তের ম্যাচ ঠিকঠাক থাকলেও শেষ ম্যাচে এসে ফিক্সিংয়ের গন্ধ পান রাশিয়ান চেস ফেডারেশনের প্রধান গ্র্যান্ডমাস্টার আন্দ্রেই ফিলাতোভ। রাশিয়ার সংবাদ সংস্থা তাস’কে তিনি বলেন, লিরেন যে পজিশনে ছিলেন- সেখান থেকে একজন প্রথম শ্রেণির দাবাড়ুর পক্ষে হেরে যাওয়া কঠিন। এটি ম্যাথমেটিক্যালি ড্র-ই ছিল। এ ম্যাচের অধিকতর তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। কারণ এটাকে ইচ্ছাকৃত মনে হচ্ছে। ফিলাতোভের এমন মন্তব্য যেমন বিভ্রান্ত ছড়াচ্ছে, ঠিক তেমননি সদ্য বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়া গুকেশকেও অস্বস্তির মধ্যে রেখেছেন।

এদিকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন শেষ হওয়ার পরপরই সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন রাশিয়ার গ্র্যান্ডমাস্টার ভ্লাদিমির ক্রামনিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছিলেন, ‘কোনো মন্তব্য নেই, বেদনাহত… শিশুতোষ একটি চালের সাংঘাতিক ভুলে এর আগে কখনো বিশ্বদাবার শিরোপা নির্ধারণ হয়নি।’ অপরদিকে সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ভারতের প্রথম গ্র্যান্ডমাস্টার বিশ্বনাথন আনন্দ একটা লাইভ স্ট্রিমে বলেন, যেকোনো ক্রীড়ায় চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পেছনে প্রচন্ড প্রেশার কাজ করে। ভুল খেলারই অংশ। কাজেই এটাকে আমি এচিভমেন্ট হিসেবে দেখতে চাইব। উল্লেখ্য সিঙ্গাপুরে গত বছর ২৫ নভেম্বর থেকে ১২ ডিসেম্বর বিশ্বদাবার এ শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই অনুষ্ঠিত হয়।

একনজরে ফিদে বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা…
নাম দেশ
১. উইলহেম স্টেইনিজ অস্ট্রিয়া/হাঙ্গেরি/মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র
২. ইমানুয়েল লাস্কার জার্মানি
৩. হোসে রাউল ক্যাপাবøাঙ্কা কিউবা
৪. আলেকজান্ডার আলেখাইন ফ্রান্স
৫. ম্যাক্স ইউওয়ে নেদারল্যান্ডস
৬. মিখাইল বতভিনিক সোভিয়েত ইউনিয়ন
৭. ভ্যাসিলি স্মিসলভ সোভিয়েত ইউনিয়ন
৮. মিখাইল তাল সোভিয়েত ইউনিয়ন
৯. টাইগ্রান পেট্রোসিয়ান সোভিয়েত ইউনিয়ন
১০. বরিস স্পাসকি সোভিয়েত ইউনিয়ন
১১. ববি ফিশার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র
১২. আনাতোলি কারপভ সোভিয়েত ইউনিয়ন
১৩. গ্যারি কাসপারভ সোভিয়েত ইউনিয়ন/রাশিয়া
১৪. ভøাদিমির ক্রামনিক রাশিয়া
১৫. বিশ^নাথন আনন্দ ভারত
১৬. ম্যাগনাস কার্লসেন নরওয়ে
১৭. ডিং লিরেন চীন
১৮. গুকেশ ডোমরাজু ভারত।