নারী বিশ্বদাবায় টানা পঞ্চমবার চ্যাম্পিয়ন ওয়েনজুন

।। মোরসালিন আহমেদ ।।

ফিদে নারী বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপে টানা পঞ্চমবারের মতো শিরোপা জয় করলেন স্বাগতিক চীনের গ্র্যান্ডমাস্টার জু ওয়েনজুন। ১২ ম্যাচ সিরিজের এ লড়াইয়ে ৩ ম্যাচ হাতে রেখেই এ কৃতিত্ব অর্জন করেন। এক তরফার এ চ্যাম্পিয়নশিপে ৯ ম্যাচে তিনি ৬.৫-২.৫ পয়েন্টে সাবেক চ্যাম্পিয়ন স্বদেশী গ্র্যান্ডমাস্টার তান ঝংইকে হারিয়ে শিরোপা অক্ষুন্ন রেখেছেন। তবে বোর্ডে খেলা গড়ানোর শুরুতে বোঝা যায়নি আসরটি এতো সহজ হবে। কেননা প্রথম ম্যাচ পয়েন্ট ভাগাভাগির মধ্য দিয়ে শেষ হওয়ায় অনেকে ভেবেছিলেন জমজমাট লড়াই হবে। দ্বিতীয় ম্যাচে তান ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন জুকে হারিয়ে সেটারই জানান দিয়েছিলেন। তৃতীয় ম্যাচে জু তানকে হারিয়ে সমতায় ফিরলে হাড্ডাহাড্ডির আভাস ছড়িয়েছিল। চতুর্থ রাউন্ড ড্র হওয়ায় সবাই ধরে নিয়েছিলেন জুয়ের জন্য শিরোপা অক্ষুন্ন রাখা কঠিন হয়ে যেতে পারে। তান ফ্যানরা হয়ত ভেবেই বসেছিলেন অর্ধযুগ পর শিরোপা পুনরুদ্ধার করতে যাচ্ছেন।

প্রথম চার ম্যাচ পর্যন্ত লড়াইটা হাড্ডাহাড্ডির মধ্যেই চলছিল। কিন্তু পঞ্চম রাউন্ড থেকে জু চ্যালেঞ্জার তানের বিপক্ষে আগ্রাসী হয়ে উঠবেন সেটা কারোর ধারণায় ছিল না। প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ লড়াইকে তিনি আকাশ থেকে মাটিতে নামিয়ে আনবেন তা কেউ কল্পনা করেননি। এমন কি, শেষ পর্যন্ত একতরফায় পরিণত হবে তাও বোঝা যায়নি। পঞ্চম থেকে অষ্টম রাউন্ড অর্থাৎ টানা চার রাউন্ড তানকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তোলার বিন্দুমাত্র সুযোগ দেননি। জয় তো দূরের কথা, একটি ম্যাচও ড্র করার সুযোগ দেননি। পরপর টানা চার জয়ে জু শিরোপার কাছাকাছি পৌঁছে যান। নবম রাউন্ডে নুন্যতম ড্র করলেই শিরোপা অক্ষুন্ন, তাই জয়ের পথে হাঁটেননি। তানের সঙ্গে পয়েন্ট ভাগাভাগি করে তিন ম্যাচ হাতে রেখে টানা পঞ্চমবারের মতো চ্যাম্পিয়ন হয়ে দারুণ কৃতিত্ব দেখান। সাবেক চ্যাম্পিয়ন তান এতো সহজে হার মেনে নেবেন বা পঞ্চম রাউন্ড থেকে খৈই হারিয়ে ফেলবেন তা ছিল কল্পনার বাইরে। উল্লেখ্য চলতি বছরের এপ্রিল মাসে নারী বিশ্বদাবা চ্যাম্পিয়নশিপ অনুষ্ঠিত হয়।

পরিসংখ্যানে বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপ
জু শিরোপা অক্ষুন্ন রাখার প্রত্যয়ে বোর্ডে লড়েছিলেন। তান খেলেছিলেন শিরোপা পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে। অল চায়না লড়াইয়ে দাবা বোর্ডে শুধু স্নায়ু যুদ্ধের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ ছিল না। ৯ ম্যাচে তাদের এ লড়াই পরিসংখ্যানেও প্রতিফলিত হয়েছে।

জু-তান
জু এবং তান উভয় ১৯৯১ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তাদের বয়স এখন ৩২। দু’জনেরই ওপেন গ্রæপ থেকে গ্র্যান্ডমাস্টার খেতাব পেয়েছেন। নারী দাবায় এ মুহূর্তে জু দ্বিতীয় শীর্ষবাছাই এবং তান তৃতীয় শীর্ষবাছাই খেলোয়াড়। জু ২৫৬১ এবং তানের রেটিং ২৫৫৫।

মোট চাল খেলেছেন
উভয় খেলোয়াড়ই ৯ ম্যাচে মোট ৫১৭টি চাল খেলেছেন। ওপেনিং, মিডল ও অ্যান্ড গেম মিলে প্রতি ম্যাচে খেলেছেন ৫৭.৪ চাল।

বোর্ডে কাটানো মিনিট
৯ ম্যাচে জু আর তান ২২৪৬ মিনিট বোর্ডে কাটিয়েছেন। অর্থাৎ ৩৭.৪৩ ঘণ্টার কাছাকাছি তাদের লড়াই হয়েছে। শিরোপা জয়ের লক্ষ্যে প্রতি ম্যাচে তারা ৪.১৫ ঘণ্টার বেশি বোর্ডে মনোযোগ ও মানসিক পরিশ্রম করেছেন।

দীর্ঘতম চালে জয়
তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ তৃতীয় ম্যাচে জু ৮৭ চালে জয় পেয়েছিলেন। ম্যাচ শেষ হতে সময় লেগেছিল ৩২৬ মিনিট। অর্থাৎ ৫.৪৩ ঘণ্টা। তানের বিপক্ষে এ ম্যাচটিই মূলত টার্নিং পয়েন্ট ছিল।

সবচেয়ে কম চালে জয়
সবচেয়ে কম চালে জয় পেয়েছেন জু। সিরিজের সপ্তম ম্যাচে তিনি তানের বিপক্ষে ৪৭ চালে জয় পেতে সময় নেন ২৪২ মিনিট। অর্থাৎ ৪.০৩ ঘণ্টা।

সর্বোচ্চ নির্ভুল খেলা
জয়ের সর্বোচ্চ নির্ভুলতা রেকর্ড হয়েছিল অষ্টম ম্যাচে। যেখানে জু কালো ঘুঁটি দিয়ে ৯৮% নির্ভুল খেলেছিলেন। তান মিডলগেমে ভুল করার পর জু একের পর এক নির্ভুল চাল দেওয়ায় প্রতিপক্ষকে ফিরে আসার কোনো জায়গা রাখেননি।

ম্যাচ জুড়ে গড় নির্ভুলতা
উভয় খেলোয়াড়ই ম্যাচের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে নির্ভুলভাবে খেলার চেষ্টা করেছেন। ম্যাচ জুড়ে গড় নির্ভুলতার রেকর্ডে জু ৯৬.৪% এবং তান ৯৪.৬% খেলেছেন। জু এক্ষেত্রে সামান্য এগিয়ে ছিলেন।

সবচেয়ে জনপ্রিয় ওপেনিং/ডিফেন্স
এ আসরে চ্যালেঞ্জার তান কালো ঘুঁটি নিয়ে সবচেয়ে বেশি সিসিলিয়ান ডিফেন্সে খেলেছেন। এটি তাঁর অন্যতম প্রিয় ডিফেন্সের একটি। তিনি ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন জুকে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করেছেন। স্নায়ু যুদ্ধের এ লড়াইয়ে উভয় খেলোয়াড়কে অবশ্য ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে তাল মিলিয়ে খেলতে হয়েছে। সাদা ঘুঁটি নিয়ে কৌশলগতভাবে জু জয় তুলে নেন।

জয়-পরাজয়-ড্র
৯ ম্যাচে সাদা ঘুঁটি থেকে এসেছে ৪টি জয়। বিপরীতে কালো ঘুঁটি পেয়েছে ২টি জয়। অন্যদিকে ড্র হয়েছে ৩টি ম্যাচ। ৯ ম্যাচে শিরোপা ফয়সালা হয়ে যাওয়ায় অবশিষ্ট তিনটি ম্যাচ খেলার প্রয়োজন হয়নি।

রোল অব অনার
চ্যাম্পিয়ন সাল

১. ভেরা মেনচিক ১৯২৭-১৯৪৪
২. দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ [অনুষ্ঠিত হয়নি] ১৯৪৪-১৯৫০
৩. লুডমিলা রুডেনকো ১৯৫০-১৯৫৩
৪. এলিসাভেতা বাইকোভা ১৯৫৩-১৯৫৬
৫. ওলগা রুভস্টোভা ১৯৫৬-১৯৫৮
৬. এলিসাভেটা বাইকোভা ১৯৫৮-১৯৬২
৭. নোনা গাপ্রিনভাশভিলি ১৯৬২-১৯৭৮
৮. মায়া চিবুরদানিজ ১৯৭৮-১৯৯১
৯. ঝাই জুন ১৯৯১-১৯৯৬
১০. সুসান পোলগার ১৯৯৬-১৯৯৯
১১. ঝাই জুন ১৯৯৯-২০০১
১২. ঝু চেন ২০০১-২০০৪
১৩. আন্তোয়ানেতা স্টেফানোভা ২০০৪-২০০৬
১৪. জু ইউহুয়া ২০০৬-২০০৮
১৫. আলেকজান্দ্রা কোস্তেনিউক ২০০৮-২০১০
১৬. হু ইফেন ২০১০-২০১২
১৭. আন্না উশেনিনা ২০১২-২০১৩
১৮. হু ইফেন ২০১৩-২০১৫
১৯. মারিয়া মুয়িচুক ২০১৫-২০১৬
২০. হু ইফেন ২০১৬-২০১৭
২১. তান ঝং ই ২০১৭-২০১৮
২২. জু ওয়েনজুন ২০১৮-বর্তমান।