দেশকে দ্রুত সময়ে দুইজন গ্র্যান্ডমাস্টার উপহার দিতে চাই: তৈয়বুর

।। মোরসালিন আহমেদ ।।

ঘরোয়া ক্রীড়াঙ্গনে জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণে সার্চ কমিটির মাধ্যমে বর্তমানে বিভিন্ন ফেডারেশন পুর্নগঠন করা হচ্ছে। চলমান সংস্কার প্রক্রিয়ার প্রেক্ষাপটে জাতীয় দাবাড়ু ফিদেমাস্টার ড. মো. তৈয়বুর রহমান সুমন বাংলাদেশ দাবা ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পেয়েছেন। কর্মজীবনে তিনি একজন উচ্চপদস্থ সরকারী কর্মকর্তা। ডাক ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব পদে কর্মরত রয়েছেন। দাবার অ্যাডহক কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেয়ে একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি তাঁর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন পাক্ষিক ক্রীড়াজগতকে। কিভাবে তিনি দাবার হারানো ঐহিত্য ফিরিয়ে আনবেন, দাবাকে ফের আগের জায়গায় কিভাবে নেবেন, হঠাৎ করে কেনোই বা মুখ থুবড়ে পড়েছিল দাবা। সম্ভাবনাময় এ খেলাটি নিয়ে সবকিছুর উত্তর দিয়েছেন। দাবার অতীত, বর্তমান ও ভবিষৎ নিয়ে তাঁর আলাপচারিতার চুম্বক অংশ এখানে তুলে ধরা হলো।

প্রশ্ন: দাবাড়ু থেকে হঠাৎ সংগঠক- ভাবতে কেমন লাগছে?
তৈয়বুর রহমান:
আমার কিন্তু সংগঠকের চেয়ে নিজেকে দাবাড়ু ভাবতেই বেশি ভাল লাগে। আমি তো দাবাড়ু, খেলতে চাই। কিন্তু বিশেষ পেক্ষাপটে দায়িত্ব নিতে হয়েছে। শুরুতে দায়িত্বটা নিতে চাইনি। কারণ আমি সরকারি চাকুরিজীবি। কর্মজীবনে প্রচণ্ড রকম ব্যস্ততা রয়েছে। জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার গণ অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যখন নানামুখি সংস্কারের মাধ্যমে সব খাত থেকে দূর্নীতি নির্মূলে চেষ্টা করছিলেন তখন ক্রীড়াঙ্গনও এর বাইরে ছিল না। সেই ধারাবাহিকতায় অন্যসব ক্রীড়া ফেডারেশনের মতো রাজনৈতিকমুক্ত জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণে দাবা ফেডারেশনেও সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেসময় বিভিন্ন মহল থেকে আমাকে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব নিতে সম্মতি চাওয়া হচ্ছিল। বিশেষ করে অ্যাসোসিয়েশন অব চেস প্লেয়ার্স বাংলাদেশ এর নেতৃবৃন্দ, এমন কি গ্র্যান্ডমাস্টার, আন্তর্জাতিকমাস্টার ও সিনিয়র দাবাড়ুরাও অনুরোধ করেছিলেন আমি যেনো দায়িত্বটা নেই। তবে সবাইকে না করে দিয়েছিলাম। বলেছি, সরকারি কাজে আমার যে ব্যস্ততা তাতে ঠিক হবে না। তাছাড়াও একটা প্রচলিত বিবেচনা হচ্ছে যিনি নিজেই আর্থিক স্পন্সর হতে পারবেন তিনি এসব পদে আসবেন। আমি সেই ক্যাটাগরিতে পড়ি না। আমি জানি না- সাধারণ সম্পাদক হিসেবে কে বা কারা আমার নাম সার্চ কমিটিতে দিয়েছিলেন। একদম শেষ মুহূর্তে মন্ত্রণালয় থেকে একটি টিম আমার সঙ্গে আলোচনা করেন। বলছিলেন, খেলোয়াড়, যোগ্যতা এবং দাবা জগতের মোটামুটি সবার গ্রহণযোগ্য হিসেবে আপনাকে দায়িত্ব নিতেই হবে। বলতে পারেন এভাবেই দাবাড়ু থেকে হঠাৎ সংগঠক বনে গেলাম।

প্রশ্ন: আপনি তো জাতীয় দলেও খেলেছেন। দাবায় আপনার বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ার রয়েছে। কিন্তু শুরুটা করলেন কিভাবে?
তৈয়বুর রহমান: সেই ছেলেবেলা থেকে দাবার সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলেছিলাম। কিন্তু সেভাবে কখনো কম্পিটিশনে খেলা হয়ে উঠেনি। ১৯৯১ সালে নটরডেম কলেজে একবার ইন্টার কলেজ চেস টুর্নামেন্ট আয়োজন করেছিল। তখন আমি বিএএফ শাহীন কলেজের ছাত্র। আমাদের কলেজও অংশগ্রহণ করেছিল। সেসুবাদে খেলতে এসেছিলাম। উদ্বোধনী রাউন্ডে খেলা পড়েছিল নারায়ণগঞ্জ সরকারী তোলারাম কলেজের সঙ্গে। আমার প্রতিপক্ষ ছিলেন সাবেক জাতীয় দাবাড়ু কালিমউল্লাহ খান কালাম। ভীষণ অ্যাটাকিং প্লেয়ার ছিলেন। ঢাকা কিংবা জাতীয় পর্যায়ে বলতে পারেন এটাই আমার প্রথম টুর্নামেন্ট এবং প্রথম খেলা। সেই খেলায় জিতেছিলাম। ওইদিনই রিফাতের [গ্র্যান্ডমাস্টার রিফাত বিন সাত্তার] সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। ও’ তখন নটরডেম কলেজে পড়ে। ওদের কলেজ চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। এমন কি, ওইদিনই রিফাত আমাকে দাবা ফেডারেশনে নিয়ে গেলেন। এরপর ১৯৯৪ সালে ন্যাশনাল প্লেয়ার হলাম। দাবা অলিম্পিয়াড দলে ছিলাম। কিন্তু ক্লাস শুরু হয়ে যাওয়ায় খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় চলে গিয়েছিলাম, আর নিয়াজ ভাই সরাসরি খেলায় সেবার অলিম্পিয়াডে যাওয়া হয়নি। তবে অলিম্পিয়াড খেললাম ১৯৯৮ সালে। এরপর ২০২১ সালে ফিদেমাস্টার হলাম। আমার একটি আন্তর্জাতিকমাস্টার নর্মও আছে। ২০১৪ সালে অলিম্পিয়াডে ননপ্লেয়িং ক্যাপ্টেন ছিলাম। দেশের হয়ে অনেক টুর্নামেন্ট খেলেছি। অ্যামাচার হিসেবে ভবিষৎতেও খেলতে চাই।

প্রশ্ন: আপনি এমন এক সময় দায়িত্ব নিলেন যখন দাবায় ক্রাইসিস চলছে! এই ক্রাইসিসটা আসলে শুরু হয়েছিল কবে?
তৈয়বুর রহমান:
দেখুন, দাবায় গর্ব করার মতো আমাদের অনেক ঈর্ষণীয় সাফল্য রয়েছে। দাবা গুরু ড. কাজী মোতাহার হোসেন স্যার ছিলেন উপমহাদেশের বিখ্যাত দাবাড়ু। উপমহাদেশের মধ্যে নিয়াজ ভাই [গ্র্যান্ডমাস্টার নিয়াজ মোরশেদ] প্রথম গ্র্যান্ডমাস্টার হয়েছেন। রানী আপা [নারী আন্তর্জাতিকমাস্টার রানী হামিদ] তিনবার বৃটিশ নারী দাবার চ্যাম্পিয়ন। গ্র্যান্ডমাস্টার রিফাত বিন সাত্তার, গ্র্যান্ডমাস্টার আবদুল্লাহ আল রাকিব, গ্র্যান্ডমাস্টার এনামুল হোসেন রাজীব ও প্রয়াত গ্র্যান্ডমাস্টার জিয়াউর রহমানসহ অনেক দাবাড়ু আন্তর্জাতিক আঙিনায় অসংখ্যবার সাফল্য পেয়েছেন। সদ্য অ্যাডহক কমিটির সভাপতি সুজা আঙ্কেল [সৈয়দ সুজাউদ্দিন আহমেদ] যখন ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতি ছিলেন তাঁর আমলেই চারজন গ্র্যান্ডমাস্টার পেয়েছিলাম। আমরা কিন্তু সঠিক পথেই এগোচ্ছিলাম। তবে আমি মনে করি দাবার এই ক্রাইসিসটা শুরু হয়েছিল ২০০৯ সালে মোকাদ্দেছ সাহেব [সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. মোকাদ্দেছ হোসাইন] এর আমলে। সরকার পরিবর্তনের পরেই তিনি রাজনৈতিক যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে যোগ্যতা বা গ্রহণযোগ্যতা না থাকা সত্বেও তিনি এ পদে অধিষ্ঠিত হন। তাঁর দাবা সংশ্লিষ্ট নানামুখি কর্মকান্ডের প্রতিবাদে সেসময় রিফাত, রাকিব, রাজীবসহ অনেক সিনিয়র-জুনিয়র কৃতী ও উদীয়মান দাবাড়ুরা খেলা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলেন, আমিও বর্জন করেছিলাম। সেসময়ে দাবা শুধু দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্তই হয়নি, সেই সঙ্গে বিশাল একটা গ্যাপ তৈরি হয়েছিল। এরপর শেষ তিন/ চার বছর বিভিন্ন কারণে দাবা আরো চরম ক্রাইসিসের মধ্যে চলে এসেছে। সেসময় দায়িত্বে ছিলেন শামীম ভাই [সদ্যবিদায়ী সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ শাহাবউদ্দিন শামীম]। দাবায় যে ক্রাইসিস চলছে সবাই মিলেমিশে দাবাকে আবার আগের জায়গায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করব।

প্রশ্ন: অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সব খাতের মতো ক্রীড়াঙ্গনেও সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছেন। তারই পেক্ষপটে আপনি দাবার সাধারণ সম্পাদক। ফেডারেশনে সহসাই কি সংস্কার দেখতে পাব?
তৈয়বুর রহমান:
১৯৯১ সাল থেকে একজন নিয়মিত খেলোয়াড় হিসেবে দাবার অতীত-বর্তমান আমার অজানা নয়। কোথায় কখন কি হয়েছে সবকিছুই নখদপর্ণে। কাজেই খেলোয়াড়দের স্বার্থ সংশ্লিষ্টতাই আমার কাছে বেশি অগ্রাধিকার পাবে। খেলাটা আমার কাছে প্যাশন। দায়িত্ব পাওয়ার পর অনেকগুলো সংস্কার অলরেডি হাতে নিয়েছি। জানি না, অন্যদের কাছে কি রকম গ্রহণযোগ্য হবে। দাবার ডিসিশন মেকিংয়ে খেলোয়াড়দের মতামত নিতে চাই। যেকোনো বয়স পর্যন্ত দাবা খেলোয়াড়েরা খেলতে পারেন, তাই তাদের খেলোয়াড় অবস্থাতেই সংগঠকের ভূমিকা নেওয়ার সুযোগ থাকা দরকার। আমাদের বর্তমান নীতি হচ্ছে, খেলোয়াড়দের চাহিদা ও আমাদের আর্থিক সামর্থ্য অনুযায়ী ফেডারেশন কার্যক্রম গ্রহণ করবে। এ কালচারটা গড়ে তুলতে চাই। এটাও এক ধরনের সংস্কার। যা অতীতে হয়নি, এখন থেকে হবে। আমরা ইতিমধ্যে ১০টিরও বেশি উপ-কমিটি গঠনের জন্য কাজ করছি যাতে খেলোয়াড়রাও যুক্ত থাকবেন। দ্বিতীয়ত ফেডারেশনের শেষ চার বছরের অডিট রিপোর্ট চেয়েছি। এ সংক্রান্ত কমিটি করে দিয়েছে। প্রয়োজনে থার্ডপার্টি দিয়েও অডিট করাতে পারি। এমন কি অনিয়ম দুর্নীতি পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের মাধ্যমে ন্যাশনাল ব্যাংকের একটি পত্র পেয়েছি। তারা ২০২১ সালে ২ কোটি টাকা ফেডারেশনকে দিয়েছে। সেই অর্থ ব্যয়ের বিস্তারিত জানতে চেয়েছে। আমরাও তা খতিয়ে দেখছি যে কি কাজে এবং কি উপায়ে সেই অর্থ ব্যয় হয়েছে সেটার ফলাফল কি ইত্যাদি। এরপরে সেই পত্রের জবাব দেওয়া হবে।

প্রশ্ন: বিদায়ী কমিটি কিছু কিছু ক্ষেত্রে এমন উচ্চ বিলাসী আয়োজন করেছে সেটি দাবার জন্য কতটা লাভবান হয়েছে বলে আপনি মনে করেন?
তৈয়বুর রহমান:
চমৎকার প্রশ্ন। ঠিকই বলেছেন। বিদায়ী কমিটি কিছু কিছু ক্ষেত্রে উচ্চ বিলাসী আয়োজন করেছেন। কিন্তু সে থেকে দাবা আশানুরূপ উপকৃত হয়নি। এই অর্থ যে তারা আনতে পেরেছেন সেটার জন্য তাদের সাধুবাদ। তবে সেই অর্থ দাবার স্বার্থে ব্যয়ে কোনো দক্ষতা দেখাতে পারেননি বলে আমাদের মনে হয়। ওইসব আয়োজনে কর্মকর্তারা হয়ত ফোকাস হয়েছেন। কিন্তু বাস্তবতার নিরিখে প্রদীপের নিচে অন্ধকার ছিল। আমরা জেনেছি, ২০১৬ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে কেবল ২০২০ থেকে ২০২২ সালে অর্থাৎ ওই দুই বছরে বেশ ভাল পরিমাণ তহবিল এসেছে। টাকাটা যেখানে খরচ করার প্রয়োজন ছিল, সেখানে করা হয়নি। যেসব আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট করা হয়েছিল তা যথাযথ পরিকল্পনা করে করা হয়নি। ফলে আমাদের দাবাড়ুরা তাতে উপকৃত হননি। বিভিন্ন অপ্রয়োজনীয় লজিস্টিক কাজে অস্বাভাবিক অর্থ ব্যয় করা হয়েছে, অখচ এখন ফেডারেশনে দেনা রেখে যেতে হয়েছে। শুনেছি, একটা স্কুল [মার্কস চেস চ্যাম্পস] টুর্নামেন্টেই ৫ কোটি টাকার মতো খরচ করেছে। এটার যে ইমপ্যাক্ট হওয়ার কথা ছিল, তা দেখতে পাচ্ছি না। আর্থিক পরিকল্পনার অভাব ছিল সেটার আয়োজনে এমনটা অনেকে বলছেন। তাহলে কেনো এতো টাকা খরচ হলো? অথচ এর পরের বছরেই আর কোনো প্রোগ্রাম হাতে নেওয়া যায়নি অর্থাভাবে। আবারো বলছি, টাকা তারা এনেছেন বটে, কিন্তু প্রোপারওয়ে খরচ করেননি। পুরোটাই মিস ইউস করেছেন। আমার মনে হয় তারা ডিসিশন মেকিংয়ে ভুল করেছেন। আমাকে বছরে ওই পরিমাণ অর্থ দিলে দাবার রুগ্নচেহারাই পাল্টে ফেলতে পারব। স্পন্সরদের অনুরোধ করব, আপনারা এই ফেডারেশনকে সহায়তা করে দেখেন আমরা কি করতে পারি।

প্রশ্ন: ২০০৮ সালের পর পরবর্তী গ্র্যান্ডমাস্টারের দেখা পাচ্ছে না ঘরোয়া দাবা। অনেকে একটি দুইটি করে আন্তর্জাতিকমাস্টার নর্ম, নারী আন্তর্জাতিকমাস্টার নর্ম করে বসে আছেন। এমন কি, দেশের রেটেড দাবাড়ুদের রেটিং তলানিতে যাচ্ছিল এ নিয়েও আগের কমিটি ভেবে দেখার অবকাশ পাননি। লম্বা সময় ধরেই দেশের দাবাড়ুরা অবহেলিত। এ থেকে পরিত্রাণ পেতে কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছেন কি?
তৈয়বুর রহমান:
আমি তো দাবারই মানুষ, তাই না? কে কোন নর্ম পেয়ে আটকে আছেন, কেনো তারা পরবর্তী এগোতে পারছেন না, কোথায় তাদের ঘাটতি, কেনো লক্ষ্যে পৌঁছুতে পারছে না- দাবার সঙ্গে আমরা যারা রয়েছি সবারই এ নিয়ে কম-বেশি ধারণা রয়েছে। সদ্যবিদায়ী কমিটিতে দাবার কারিগরি দিক নিয়ে যে ভাববেন, পরিকল্পনা নেবেন- এমন লোকজন কতজনই বা ছিলেন! দাবাড়ুদের এগিয়ে না যাওয়ার পেছনে এটিও একটি কারণ। তারা খেলোয়াড়দের কাছ থেকে কোনো পরামর্শও নেননি তেমনভাবে। দায়িত্ব নেওয়ার পর এসব বিষয়গুলো নিয়ে চকআউট করছিলাম যে, হাউ টু গেট মোর টাইটেলস হোল্ডার্স। এ মুহূর্তে আমি দুই আন্তর্জাতিকমাস্টার মোহাম্মদ ফাহাদ রহমান ও মনন রেজা নীড় এদের দিকে বিশেষ জোর দিতে চাই। তারা এখন পিকফর্মে রয়েছেন। ইতিমধ্যে তাদের সঙ্গে কথা হয়েছে। কিভাবে তারা এগোতে চান, তারা কোন ধরনের কোচ চান নাম জানতে চেয়েছি। এমন কি কোন টুর্নামেন্ট খেলতে স্বাচ্ছন্দবোধ করেন ও খেলতে চান সেটিরও একটি তালিকা দিতে বলেছি। আমরা লাকি, বিশেষ করে আমাদের জন্য লাক এ কারণেই যে তারা দুইজন টপ প্লেয়ার কিন্তু গ্র্যান্ডমাস্টার না। তার মানে তাদের গ্র্যান্ডমাস্টার করার আমাদের সুযোগ আছে। এখন তাদের নিয়ে যদি পরিকল্পিতভাবে বিনিয়োগ করতে পারি তাহলে আগামী একবছরের মধ্যেই গ্র্যান্ডমাস্টার বানানো সম্ভব। দেশকে ১৬ বছর পর গ্র্যান্ডমাস্টার উপহার দিতে পারব। তারা দুইজনই কমপ্লেইন করেন আগের কমিটি তাদের সাপোর্ট করেননি। আমি ওই দায়টা নিতে চাই না। যারা টপে আছেন, যারা পোটেনশিয়াল আছেন তাদেরকে গুরুত্ব দিতে হবে। আপনি বলছিলেন, নর্ম নিয়ে অনেকে বসে আছেন। তাদের নিয়েও আমাদের পরিকল্পনা আছে। তাদের জন্য স্পেশাল টুর্নামেন্ট করার চিন্তা-ভাবনা রয়েছে। এটা তাদের সুযোগ দেওয়া নয়, এটা আমাদেরই প্রয়োজন, আমাদেরই তো টাইটেল প্রয়োজন। তাদের সফলতা মানে আমাদের সফলতা। আর হ্যাঁ, আপনি ঠিকই বলেছেন দীর্ঘ দিন ধরে আমাদের দাবাড়ুদের আন্তর্জাতিক রেটিং আশঙ্কাজনকভাবে নেমে যাচ্ছে। এ মুহূর্তে মাত্র দুইজনের ২৪০০ ঘরে রেটিং। ২৩০০ ঘরে আছে পাঁচ-ছয় জন। যা আমাদের জন্য লজ্জাজনক। অবশ্যই রেটিং বাড়ানোর উদ্যোগ নেব। আমার লক্ষ্য টপ ফিফটি। শীর্ষ দাবাড়ুরা বছরে একজন দাবাড়ু অন্তত ৫০টির বেশি যাতে ম্যাচ খেলতে পারেন সেদিকে লক্ষ্য থাকবে।

প্রশ্ন: শুধু খেললেই তো রেটিং, নর্ম, টাইটেল আসবে না। ট্রেনিং ফ্যাসিলিটিও প্রয়োজন। যা বিগত কমিটির বেলায় মাঝে মধ্যে দায়সারা গোছের দেখা গেছে। আপনি নিজেও একজন দাবাড়ু, দাবাড়ুদের দু:খ বোঝেন- এ নিয়ে আপনার কি কোনো পরিকল্পনা আছে?
তৈয়বুর রহমান:
কোচিং বলুন আর ট্রেনিং ফ্যাসিলিটিজ বলুন- এ নিয়ে আমাদের একটা বড় পরিকল্পনা আছে। এক্ষুণি খোলাসা করতে চাই না। এ নিয়ে অলরেডি কাজ শুরু করেছি। এক্ষেত্রে তৃণমূল থেকে জাতীয় পর্যায় সমান গুরুত্ব দিতে চাই। রুট লেবেলে অর্থাৎ প্রাইমারি স্কুল থেকে দাবার পরিবেশ গড়ে তুলতে চাই। জাতীয় পর্যায় এইজভিত্তিক এবং টপ প্লেয়ারদের নিয়ে বছরব্যাপী প্রশিক্ষণ কার্যক্রম রাখতে চাই। মিড লেবেল এমনকি যারা অ্যামেচার তাদেরও কোচিং প্রোগ্রামের আওতায় আনতে চাই। যেখানে গুরুত্ব বিবেচনায় দেশ-বিদেশের কোচ থাকবেন। আরেকটি বিষয় হচ্ছে বিশ্বদাবার মঞ্চে যেমন: অলিম্পিয়াড, ওয়ার্ল্ডকাপ কিংবা সিনিয়র-জুনিয়র টুর্নামেন্টগুলোয় বিশেষ প্রস্তুতি ছাড়া অংশগ্রহণের একটা কালচার গড়ে উঠেছে। এখানেও সংস্কার আনতে চাই। শুধু পাঠালেই তো হবে না, সেখানে আমাদের ভাল করার সম্ভাবনা আছে কিনা সেটাও ভেবে দেখতে হবে। নামকাওয়াস্তে অংশগ্রহণ করে দেশের র্দুনাম কামাতে চাই না। এখন থেকে বাইরের টুর্নামেন্টগুলোয় যাবার আগে বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রস্তুতি শেষেই টিম পাঠাব, প্লেয়ার পাঠাব। আশা করছি, খুব শিগগিরই এর একটি রূপরেখা দেখতে পাবেন।

প্রশ্ন: আপনি বলছিলেন, যেখানে সাফল্য আসবে না, নুন্যতম ভাল করার সম্ভাবনা নেই- সেখানে টিম কিংবা প্লেয়ার পাঠিয়ে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করতে চান না। সত্যিই এমন যদি ভেবে থাকেন তাহলে এবার আননেসেসারি বিদেশ যাওয়ার হিড়িক কমবে কি?
তৈয়বুর রহমান:
দেখুন, এ আঙিনায় কে কতজন সিরিয়াস দাবাড়ু আমরা যারা দাবার সঙ্গে সম্পৃক্ত সবাই কমবেশি অবগত রয়েছি। কাজেই নামকাওয়াস্তে অংশগ্রহণ অন্তত আমার বেলায় চলবে না। আর বিদেশ যাওয়ার হিড়িক তো প্রশ্নেই আসে না। ফেডারেশনের নিজ খরচায় পাঠাক কিংবা কেউ ব্যক্তিগত খরচায় যাক এখানেও জবাবদিহিতা থাকবে। ইনভাইটেশন নিয়ে এলাম আর চলে গেলাম- এখন থেকে এটা আর হবে না। যিনি যাবেন তিনি ওই টুর্নামেন্টের জন্য কতটা প্রস্তুত, কতটা যোগ্য, দেশেই বা তাঁর সাফল্যই কি, কিংবা সেখানে গিয়ে সম্ভাব্য কি ধরনের সম্ভাবনা রয়েছে সবকিছুই একটা যোগ্যতার মাপকাঠিতে পাঠানো হবে। অলরেডি এ সংক্রান্ত বিষয়ে আমাদের রেটিং অফিসারকে [আন্তর্জাতিক আরবিটার হারুন অর রশিদ] দিক-নিদের্শনা দিয়েছি।

প্রশ্ন: বিদেশ প্রসঙ্গ যখন এসেই গেল এ সংক্রান্ত আরেকটি প্রশ্ন করতে চাচ্ছিলাম। সদ্যবিদায়ী কমিটির বেলায় দেখা যেত বিশেষ করে ইউরোপ-আমেরিকার টুর্নামেন্টে প্লেয়ারদের চেয়ে কর্মকর্তার সংখ্যা বেশি থাকত। তাদের দলবেধে যাওয়ার একটা প্রবণতা ছিল। এমন কি, ব্যক্তিবিশেষ একজনকেই বারবার পাঠানো হত। আপনার বেলায়ও কি কেউ এমন বিশেষ সুবিধা পাবে?
তৈয়বুর রহমান:
আপনি যে প্রশ্নটি করেছেন কিংবা যেদিকে ইঙ্গিত দিচ্ছেন, আমি বুঝতে পেরেছি। আপনাকে খোলাসা করে বলতে পারি, অন্তত আমার বেলায় এ ধরনের কিছু হবে না। আমাদের কমিটিতে ওয়ান ম্যান, টুম্যান শো বলতে কিছু থাকবে না। বিশেষ ব্যক্তিবর্গকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। বিভিন্ন বিবেচনায় সরকার গঠিত এই কমিটি দাবায় এখন পর্যন্ত সেরা তা অনেকেই বলছেন। এই কমিটিতে যারা এসেছেন তারা নিজ নিজ পজিশনে সবাই প্রতিষ্ঠিত ও সফল এবং খুবই ব্যস্ত ও কর্মঠ মানুষ। টিমের প্রয়োজনে যদি কাউকে পাঠানোই হয় তাহলে যোগ্যতার মাপকাঠিতে যোগ্য লোকই যাবেন।

প্রশ্ন: একটু ভিন্ন প্রসঙ্গে ফিরতে চাচ্ছি। দেশে ফিদে ও ন্যাশনাল আরবিটারের সংখ্যা বেড়েছে। কিন্তু পরিচিত মুখ ছাড়া অন্যরা খেলা পরিচালনার জন্য তেমন সুযোগ পান না। বলতে গেলে একটা সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে! আবার ব্যক্তিবিশেষ কেউ কেউ জুনিয়র হয়েও অনেক সিনিয়রদের টপকে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে ডেপুটি আরবিটার হিসেবে দেখা গেছে। আপনার সময়ও কি এ কালচারটা বজায় রাখবেন?
তৈয়বুর রহমান:
নানারকম বৈষম্য দূরকরণের জন্যই কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই অ্যাডহক কমিটি গঠন করেছেন। দাবার প্রতিটি সেক্টর সংস্কারের আওতায় আনব। আগেই বলেছি, এ জন্য আমরা ১০টিরও বেশি উপ-কমিটি গঠন করার সিদ্বান্ত নিয়েছি। এর মধ্যে আরবিটার্স কমিটি অন্যতম। সেই কমিটি গাইডলাইন দেবে। আমরা বাংলাদেশের আরবিটার প্রোফেশনটাকে কিভাবে ছড়িয়ে দিতে পারি, কিভাবে গ্রো করতে পারি, কিভাবে আন্তর্জাতিক আরবিটার তৈরি করতে পারি এবং এটা যেনো ওয়ানম্যান শো, টুম্যান শো, থ্রিম্যান শো না হয় সেখানেও নজরদারি থাকবে। আমি জানি, বিগত কমিটির আমলে আরবিটার মনোনয়নে অভিযোগ-অনুযোগ ছিল। আমি দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে পারি আমাদের সময় এমন কিছু হবে না। যোগ্যতার নিরিখেই সবকিছু হবে।

প্রশ্ন: যখন দায়িত্ব নিলেন তখন বিদায়ী কমিটি ফেডারেশনকে কি অবস্থায় রেখে গেছেন?
তৈয়বুর রহমান
: এক কথায় শূন্যহাতে আমাকে শুরু করতে হচ্ছে। দায়িত্ব নেওয়ার পর দেখি ফিদে [আন্তর্জাতিক দাবা ফেডারেশন] আমাদের কাছে কয়েক বছরের বার্ষিক ফি, টুর্নামেন্ট রেজিস্ট্রেশন ফি বাবদ প্রায় ২৫ লাখ পাবে। এরপর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট চেক করতে গিয়ে দেখি ৮ লাখ টাকার ট্যাক্স দাবি আছে তাদের। খেলোয়াড়রা পাবেন প্রায় ১০ লাখ টাকা। আরো কে কি পাবেন এ মুহূর্তে আমার জানা নেই। বলতে পারেন বিদায়ী কমিটির প্রায় ৪০ লাখ টাকার রিনের বোঝা আমাদের বইতে হচ্ছে। দায়িত্ব নেওয়ার পর এটি রীতিমতো বড় ধরনের ধাক্কাই বটে। এ নিয়ে হতাশ নই। আমাদের কমিটিতে কয়েকজন বিত্তশালী রয়েছেন। ভাল দাবা সংগঠক রয়েছেন। সাবেক খেলোয়াড়ও আছেন। আমারও ব্যক্তিগত কিছু শুভাকাঙ্খি রয়েছেন। আশা করি সবার সহযোগিতায় দাবাকে একটা অবস্থানে নিয়ে যেতে পারব।

প্রশ্ন: যে কয়দিনই আপনি ফেডারেশনের দায়িত্বে থাকুন না কেনো, বিদায় বেলায় দেশের দাবাটাকে কোথায় রেখে যেতে চান?
তৈয়বুর রহমান:
আমার প্রথম স্বপ্ন হচ্ছে আমাদের ন্যাশনাল টিম রেজাল্ট আনবে। অনেক দিন ধরে ন্যাশনাল টিম কিছু করতে পারছে না। গত সেপ্টেম্বরে হাঙ্গেরি দাবা অলিম্পিয়াডে সবচেয়ে বাজে [ওপেন বিভাগে ৭৮তম ও নারী বিভাগে ৮১তম হয়েছে] পারফরম্যান্স করেছে। যা অতীতে কখনো এমন হয়নি। আমরা চাই আমাদের টিম অলিম্পিয়াডে ফোরটির মধ্যে থাকবে। এটা আমাদের প্রথম টার্গেট। বাট ফিফটির মধ্যে থাকলেও আমরা হ্যাপি থাকব। দ্বিতীয় টার্গেট দ্রুত সময়ের মধ্যে ফাহাদ ও নীড়কে গ্র্যান্ডমাস্টার করা। তৃতীয় টার্গেট হচ্ছে যাদের টাইটেল অর্জনে নর্মগুলো পেন্ডিং রয়েছে তাদের দিকে যত্মবান হওয়া ও অল্পসময়ের মধ্যে লক্ষ্যে পৌঁছা। চতুর্থ টার্গেট হবে- এ মুহূর্তে যেসব সম্ভাবনাময় দাবাড়– রয়েছেন তাদের আন্তর্জাতিক আঙিনায় পথ সুগম করে দেওয়া। পঞ্চম টার্গেট হচ্ছে দেশে মানসম্পান্ন আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের আয়োজন করা ও বিদেশে ভাল টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ এবং দাবাড়ুদের রেটিং বৃদ্ধি ও নিজেদের স্ট্যান্ডার্ড পর্যায় নিয়ে যাওয়া। ষষ্ঠ টার্গেট বা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ টার্গেট হচ্ছে দাবাকে তৃণমূলে ছড়িয়ে দেওয়া, দাবা অলিম্পিয়াড ইত্যাদি করার চেষ্টা করব যদি অর্থের সংস্থান করতে পারি। সর্বোপরি, দাবাড়ু ও সংগঠকদের মূল্যায়ন করা। আমরা ২০২৫ সালকে সিরিয়াস বছর ধরেই এগোতে চাচ্ছি। জানি না আমার মেয়াদ কয়দিনের বা কত দিনের। তবে যে কয়দিনই ফেডারেশনের দায়িত্বে থাকি না কেনো- নানা পরিকল্পনার মাধ্যমে দেশের দাবাকে আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরতে চেষ্টা করব। #

[সৌজন্যে: পাক্ষিক ক্রীড়াজগত > বর্ষ ৪৮ # সংখ্যা ১১ # ১৬ ডিসেম্বর ২০২৪]